ব্রেকিং নিউজ

ইসলামিক স্কুল একটি সর্বসাধারনের ওয়েবসাইট । এখানে আপনি ইসলামের যাবতীয় তথ্যাদি সঠিক রেফারেন্সে পেয়ে যাবেন । সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত সারা দিনের ফরজ,সুন্নাত সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা এখানে পেয়ে যাবেন

Thursday, May 30, 2019

জ্যোতিষী।। রম্যগল্প।।মুহাম্মদ শরিফ


                
ভোমরের মত ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছি সেই দুপুর থেকে। ভাবছি কালো প্রাণীটার মত দুইটা ডানা যদি আজ থাকত  ,ডানার ঝাঁপটায় আশেপাশের বিল্ডিংগুলোর জানালার থাই গ্লাস হয়তো বৈরুতের এক্সপ্লোশনের মত টুকরো টুকরো হয়ে যেত। কপাল-পীঠে তিরতির করে ঘাম ছুটছে। কোথায় যে পাবো ব্যাটা জ্যোতিষী কে। হাত দেখে বলে দিতো আমার পরীক্ষার রেজাল্ট, পাশ হবে কি হবে না।অন্তত টেনশনের হাত থেকে রেহাই পেতাম। গতবার ম্যাট্রিক দেয়াল পার করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি, সে গর্বের কথা পাড়াশুদ্ধ লোক জানে। যাইহোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষমেশ কাশিপুর হাটের বটগাছটার নিচে তাঁর যাবতীয় সরঞ্জামাদি পোটলায় গুছিয়ে শুয়ে থাকতে দেখলাম। একটু আগেও এখান দিয়ে গেছি হন্তদন্ত হয়ে, ব্যাটা শুয়ে আছে তাই খেয়াল করিনি। আমি কাছে গিয়ে ডাক দিতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। 
:দাদা, এইখানে শুয়ে আছেন, আর আমি যে সারা মুলুক আপনাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।  
:আজ কাল আর এ ব্যাবসা ভালো চলছে না।কদিন পর উপস করতে হবে ঠাহর করি। 
:কি বলেন?
:হ্যাঁ। 
:তো। কি করবেন ?
:চলে যাবো ভাবছি অন্য এলাকায়। আর কিছুক্ষণ থাকবো ,তারপর রওনা হবো।  
:তাহলে দাদা আমিই মনে হয় এ গাঁ এর শেষ কাস্টমার।আজ একখান পরীক্ষা ছিলো, ভর্তি পরীক্ষা। ২০ টাকার একটা নোট বের করে হাত ধরলাম দাদার সামনে। টাকাটা পকেটে রেখে আমার হাত ধরেই চমকে উঠার ভাব ধরে আমায় বললেন ,সর্বনাশ।
:সর্বনাশ?(আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো।এত কষ্ট করে তাঁকে খুঁজে বের করলাম ভালো কিছু শোনার জন্য ,আর ব্যাটা হাত দেখেই বলে সর্বনাশ)
:হ্যাঁ। একটা শনির রেখা তৈরি হচ্ছে। ১০ টাকার একটা নোট দাও।
দিলাম।না দিলে পরের কথাগুলো বলবে না জানি। 
:তোমার হাতের রেখা দেখে বোঝার উপায়ই নেই , তুমি একদিন অনেক বড় পোষ্টে চাকরি পাবে।
মনে মনে বললাম”হুম, এটা ১০ টাকার ফসল”
আমি বলালাম, আমার পরীক্ষার খবর কি ?
:খুশির খবর আছে, হাত দেখে বুঝলাম, আর ৫০ টাকা দাও,বলছি।
কি বিপদেই না পড়লাম হাত দেখাতে এসে। ৫০ টাকার আরেকটা নোট দিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললো ,তোমার শনি রেখাটাই বন্ধনি একে দিয়েছি। আর সমস্যা হবে না। আর হ্যাঁ, পরীক্ষায় পাশ করেছো। খুব ভালো পাশ।  
কথাটা শুনে তো আমি আহ্লাদে গদগদ, মনের মধ্যে খুশি তো আর ধরে না। উঠে বাড়ির দিকে রওনা হবো, ঠিক ঐ সময় জ্যোতিষী দাদা বললেন মিষ্টি খাওয়াবে না? 
:হ্যাঁ নিশ্চয়।
:কেমনে? আমিতো আর এ গাঁ-এ থাকছি না, কিছু টাকা দিয়ে দাও,কিনে খেয়ে নিবো।
কি না ভেবেই দিয়ে দিলাম আরও ১০ টাকা। বাড়ি ফিরবো, পকেটে হাত দিয়ে দেখি এক টাকাও আর নেই। হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম।
সেদিন রাতে স্বপ্নের তোড়ে আর ঘুমই আসে না। কত্ত রঙ-বেরঙের স্বপ্ন। আগামীকাল রেজাল্ট দিবে, অনেক ভালো পজিশনও হবে। জ্যোতিষী দাদার ভাষ্যমতে “অনেক ভালো পাশ”। জীবনের শনির রেখাও আর নেই ।টেনশনও আর নেই। 
রেজাল্টের দিন। তখন মোবাইলের যুগ ছিলো না। রেজাল্ট জানতে স্কুলে যেতে হতো। গিয়ে দেখি নোটিস বোর্ডে এখনো রেজাল্ট টানানো হয় নি। অনেকেই উপস্থিত হয়েছে এরই মধ্যে। স্যারের মেয়েকেও দেখলাম।এক পাশে চুপটি মেরে বসে আছে। সবাইর মুখটা দেখলাম শুকনো খটখটে। আন্দাজ করতে পারছি যে সবাই খুব টেনশনে আছে। কিন্তু আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ আমি যে ভালো পাশ করেছি তা জ্যোতিষীই বলেছেন। 
টানানো হতে না হতেই উপস্থিত সবাই হূড়মুড় করে ভীড় জমালো নোটিস বোর্ডের সামনে। আমি নিশ্চিন্তে বসে এক টাকার চুইংগাম চিবচ্ছি।দেখলাম, হিরণ চোখ মুছতে মুছতে বেরিইয়ে আসছে।বুঝলাম, ফেল মেরেছে।অনেক উপদেশ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম।রুশোও এলো মন ভারী করে।গরম স্বভাবের ছেলেটাও আজ অরম হয়ে গেছে। পড়ুয়া ছেলে এরা।তারপরও ঝেড়ে বসে আছে। নিজেকে নিয়ে গর্ব হতে লাগলো।সারা বছর না পড়েই ভালো রেজাল্ট করেছি। 
রেজাল্ট।ও মনে পড়েছে আমি এখনো নিজেরটা দেখিনি।দেখবো কখন?ছেলেগুলো ফেল করেছে।তাদের সান্ত্বনা দিতে দিতেই তো সময় চলে গেলো।এতক্ষণে ভিড় কমে গেছে । নোটিশ বোর্ডের দিকে দেখলাম এক বুক আশা নিয়ে। 
আজব!
আমার রোল নাম্বার কৈ?
চেক করলাম। আবার করলাম। বারবার চেক করেও আমার রোল নাম্বার পেলাম না। 
না। এ হতেই পারে না। জ্যোতিষী যে বললো ভালো পাশ হবে আমার। 
বুঝতে আর বাকি থাকলো না।
এই হলো ভালো পাশ? ব্যাটা মিথ্যুক। মায়ের চিনির বৈয়াম থেকে টাকা মেরে তোকে দিয়েছি। আর তুই আমার সাথে দুই নাম্বারি করলি। ধাপ্পাবাজ কোথাকার। মনে মনে গালি পাড়লাম অনেক্ষণ।
ভালো পাশের নমুনাতো দেখলাম। ওদিকে আমার আম্মু যে রাগী, তাতে শনি যে আমার কপালে আছে বুঝতে বাকি নেই।ইতিমধ্যে খবর পৌঁছে গেছে নিশ্চয়। সারাদিন বাড়িতে যাইনি মা-এর সামনে পড়ার ভয়ে।
সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে পা রাখতে যাবো অমনি কয়েকটা কিল-ঘুষি ঝড়ের মত কোত্থেকে উডে এসে হুড়মুড় করে পড়লো আমার পিঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আম্মু। এক দৌড়ে আবার পিছনের দিকের রাস্তায় চলে আসলাম। শুনতে পেলাম,”ম্যাট্রিক পাশ আর আমার টাকা না নিয়ে বাড়িতে ফিরলে তোর খবর আছে, বলে দিলাম”
রাতটা কাননদের কাচারি ঘরে কাটালাম কোনো রকমে। শালা জ্যোতিষীর খবর আছে। জানি, ও এ গায়ে আর নেই। পাশের গাঁ-এ চলে গেলাম বাজারে যেতেই দেখলাম এক পাশে বসে আছে। আমাকে দেখেই চিনে ফেললো। কি খবর জানতে চাইলো?
আমি বললাম, সবই ঠিকঠাক হয়েছে। আপনি সত্যিই মহান জ্যোতিষী। আপনার পাশে কিছু সময় কাটাতে চাই।
দেখলাম,ব্যাটা আমার মত শাগরেদ পেয়ে ভারি খুশি।। আমার মনে তো তখন অন্য কিছু। এই ভন্ড ব্যাটাকে শাস্তি না দিয়ে শান্তি পাচ্ছি না। অনেক্ষণ তাঁর পাশে বসে থাকি সুযোগের অপেক্ষায়। 
হঠাৎ বললো, বাছা একটু বসো আমি প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিয়ে আসি। আমি সুযোগটা পেয়ে গেলাম। আর হাসিমুখে বিদায় দিলাম। চোখের আড়াল হতেই জ্যোতিষীর টাকার কৌটা নিয়ে দিলাম দৌড়।বাড়িতে গিয়েই মায়ের চিনির বৈয়ামে কিছু রেখে বাকিটা  নিয়ে মামা বাড়ির উদ্দ্যেশে রওনা হলাম।    

No comments:

Post a Comment

Thank You Very Much for commenting.