বাক
মুহাম্মদ শরিফ
তিন চাকার ভ্যান গাড়িটা এসে থামলো একটা ছোট পুরনো বাড়ির সামনে। এরকম বাড়ির সামনে সাধারনত ভ্যান থেকে নামে হয়তো কোনো চাউলের বস্তা, লাকড়ী, বা খড়-পল।কিন্তু আজ একটু ভিন্নতার আভাস মিলছে বুঝি।কারণ ভ্যান চালক এলাকার পরিচিত কেউ নয় আর ভ্যানে উপবিষ্ট যাত্রী পোশাক আশাকে বোঝা যাচ্ছে সাধারন কেউ নয়,এক্কেবারে নববধুর সাঁজ ।অপরূপ তার সৌন্দর্য,সারা গায়ে অলঙ্কারের ছড়াছড়ি।বড়লোকের মেয়ে বুঝি,তাই অমন সাঁজের বাহার। উপচে পড়া সৌন্দর্য গায়ে জড়ানো লাল পাড়ের জামদানী। মেয়েটির মুখে নেই লেশমাত্র কৃত্রিম সৌন্দর্যের বিন্দু। দুই চোয়ালের উপর লালচে আবীর ।এমন সুন্দর মেয়ে দেখলে যে কারো পছন্দ হতে বাধ্য।
এই পাড়াগায়ে এমন মেয়ে তেমন দেখা মেলা ভার।ভ্যান থেকে নামতে দেখে মনজুর মা,শেফা আর বুকু এগিয়ে এসে তাকে সাহায্য করলো।গ্রামে এমন আদর আপ্পায়ন হর হামেশাই মেলে।এরা মাটির মানুষ কি না!! এই তিনজনের চোখে একটা প্রশ্ন জ্বলজ্বল করছে,আর তা হচ্ছে”কে এই মেয়েটি?”আর এ বাড়িতেই বা কেনো?” কারণ সবাই জানে এই বাড়িতে থাকে এক বৃদ্ধ আর তার স্ত্রী।তাদের দুইটি মাত্র ছেলে সন্তান তাহমীদ আর তামীম, ,শহরে পড়াশোনা করে। তাদের তো বিয়েই হয় নি, তো তাদের বউ হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। কারণ তারা অনেক ভালো, বাবা মা এর অনুমতি ছাড়া বিয়ে? তাদের পক্ষে অসম্ভব।। তো যাইহোক, মনজুর মা, মেয়েটির জিনিসপত্র ভ্যান থেকে নামাতে নামাতে বুকু তাকে সালাম করলো।সালামের জওয়াব দিতে দেরি হওয়ায় তিনজনই মেয়েটির দিকে তাকালে সে মঞ্জুর মায়ের কাছ থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে তার ভিতর থেকে একটা কাগজ বের করে সবাইকে দেখালো।তাতে লিখা”ওয়া আলাইকুমুস সালাম”
সে কি ?
মনজুর মা জিজ্ঞাসা করলো”তোমার নাম কি গো? “আরেকটা কাগজ দেখালো তাতে লিখা
মেহেরজান।
ওমা! তুমি কথা বলতে পারো না?শেফার আবেগ ভরা প্রশ্নের উত্তরে মেহেরজান একটা কাগজ দেখালো তাতে লিখা “ আমি বাক-প্রতিবন্ধী ”
এমন সুন্দর একটা মেয়ে কথা বলতে পারে না ,এমন কান্ড আগে কেউ দেখেনি কখনো, আর তাই আস্তে আস্তে মানিষের ভিড় বাড়তে থাকে। এদিকে মেহেরজান,বুকু,শেফা সবাই বৃদ্ধর বাড়ির মধ্যে চলে এসেছে।রুস্তম দাদা একটা কাঠের পুরনো চেয়ার এগিয়ে দেয় বসতে।এলাকার মহিলা,বৃদ্ধ যতটা না অবাক হচ্ছে তার চেহারা দেখে তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে তার কথা বলতে না পারা দেখে। কোনো শব্দই করতে পারে না মেয়েটি।তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে মেহেরজান লেখাপড়া জানে,অনেকের অনেক প্রশ্নের উত্তর লিখে দিচ্ছে।
যাইহোক,এবার আসল প্রশ্নটি করলো তাহমীদের মা।
আচ্ছা মা,তুমি কার কাছে,কাদের বাড়িতে এসেছো?
আগে থেকে লেখা একটা চিরকুট বের করে দেখায়।সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা” মোঃ আফজাল হোসেন। গ্রামঃসুবর্ণগ্রাম; জেলাঃ নড়াইল।
-ঠিক ঠিক।হ্যা এটাইতো।কানাকানির শব্দ শোনা যায়। সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
তাহমীদের মা আবার জিজ্ঞাসা করে” উনি কি তোমার পরিচিত? উনি তোমার কি হয় ?
আরেকটা কাগজ বের করে তাহমীদের মা কে দেখালো মেহেরজান।কাগজটিতে লেখা “আমি আপনার বড় ছেলে তাহমীদের স্ত্রী।“ আবার কানাকানি এমন মহামারী আঁকার ধারণ করলো যে এটা না করাটাই অপরাধ।তা হবেই বা না কেনো!!তাহমীদ সুদর্শন পুরুষ,সে কেনো এমন বোবা মেয়ে বিয়ে করতে গেলো তাও আবার বাবা মা এর অনুমতি ছাড়া?ছিঃছিঃ।
ওদিকে রাগে ফুসছে বুকু।এমন কাজ করতে পারলো তাহমীদ? আমি গ্রামের মেয়ে তাই হয়তো আমাকে উপেক্ষা করলো!! না না মেয়েটারই দোষ ।সে হয়তো তাহমীদকে ধোকা দিয়েছে।এমন নানা বিধঘুটে চিন্তা বুকুর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এবার মতিন চাচা এসে জিজ্ঞাসা করলো তোমার বাড়ি কোথায় মা?
আরেক কাগজ দেখালো”বলতে নিষাধ আছে।“রুস্তম দাদা হাক দিয়ে উঠলেন “ও তাহমীদের মা, তোমার তাহমীদ যেমন সুন্দর বৌমা ও পেয়েছো তেমনি সুন্দর।একদম জান্নাতী হুর।কথা বলতে পারে না এই যা।এ আর তেমন কি? যা প্রয়োজন তা তো লিখেই দিতে পারছে।শিক্ষিত আছে।কোনো সমস্যা হবে না। দাদার কথা শেষ হতেই বুকু বললো” হ চাচী, লক্ষী মেয়ে ,কোনোদিন আপনার সাথে ঝগড়ায় করবে না।এমন মেয়ে ২য় টি পাবেন না।কথাটি রাগে নাকি অভিমানে বললো সেটা বুকুই বলতে পারবে।কথাটি শুনে মেহেরজানও একটু হাসলো।
তাহমীদের মা এবার একটু ভালো করে মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই মেয়েটা অনেক লাবণ্যময়ী।নাক,চোখ মুখের গড়ন অনেকটাই তাহমীদের মতন। ইশশ।মেয়েটা যদি শুধু কথা বলতে পারতো আমার কোনো আপত্তি থাকতো না। তাহমীদের ছোট চাচী এগিয়ে এসে বললো,”আপা,আপনি একটা কাজ করেন তাহমীদকে একটা চিঠি লিখেন।চিঠির উত্তর না আসা পর্যন্ত মেহেরজান আমাদের এখানেই থাকুক। প্রস্তাবে সবাই সম্মতি জানালো।
কিন্তু ওদিকে শুরু হয়েছে আরেক কান্ড মেহেরজান তার নাক ও কানের দুল খুলতেই সবাই অবাক।এত বড় মেয়ে নাক কান কোনোটাই ফোটানো নেই। কেউ কেউ ভাবলো ধনীর দুলালী কি না,তাই হয়তো এই কষ্টটুকুও সইতে পারে নাই। কিন্তু মেয়েতো দেখছি নিন্দা না কুড়িয়ে থামবে না। মাথার কালো কেশ যে নকল,তা খুলে রাখার পর আর কারো বুঝতে বাকি নেই। এবার প্রশংসা কারীরাও নিন্দা করতে শুরু করে দিয়েছে।একটা বউ, তার মাথায় কালো লম্বা কেশ থাকবে না তা শহুরে মানুষ মানলেও গ্রামের মানুষ মানবে কি করে। মেয়ের কি আকাল পড়েছে যে কথা বলতে পারে না,মাথায় লম্বা চুল নেই,কান নাক ফুটানো নেই এমন মেয়ে বিয়ে করতে হবে। এবার কিন্তু তাহমীদের মা একটু মুচকি হাসলেন।কি জানি বাপু কেনো হাসলেন।এমন পাগলী মেয়ে যে তার পূত্রবধু সে খেয়াল কি তার আছে?বুকু চুপিচুপি বললো”ও চাচী তোমার ছেলে কেমন মেয়ে বিয়ে করেছে দেখলে তো?তোমার ছেলের কি চোখ নাই?কোনো উত্তর না দিয়ে চাচী একটু হাসলেন।বুকু রাগে উঠে দাঁড়িয়ে বললো” তোমার খুব পছন্দ হয়েছে বুঝি?
এবার একটা কাগজ দেখালো মেহেরজান আর তাতে লেখা”আমায় একটু পানি দেন।“কেউ একজন পানি এনে দিতেই মেহেরজান হাত্মুখ ধোঁয়া শুরু করলো। মুখ ধোয়া পানিতে ধুয়ে গেলো চোখের কাজল,ঠোটের গোলাপী লিপিস্টিক,চোয়ালে আটকানো রক্তিম আভা।। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতেই ছোট্ট ছেলেমেয়েরা হাততালি দিতে শুরু করলো, জোয়ান-বৃদ্ধরা হাসতে শুরু করলো , পাড়ার মহিলারা হাসতে হাসতে বলতে লাগলো সে কি কান্ড গো এ যে আমাদের তাহমীদ!
তাহমীদের আনা প্যাকেট থেকে প্রত্যেককে মিষ্টি দেওয়া শুরু হলো। সারা বাড়িতে আনন্দ আর হাসিতে মুখর হয়ে উঠে। ওদিকে বুকুর আনত নয়নের দুই কোণে দুফোটা অশ্রু জমতে দেখা যায়।। কে পরিমাপ করবে, এ অশ্রু কতটা আনন্দের ,কতটা ভালোবাসায় সিক্ত?


No comments:
Post a Comment
Thank You Very Much for commenting.