ব্রেকিং নিউজ

ইসলামিক স্কুল একটি সর্বসাধারনের ওয়েবসাইট । এখানে আপনি ইসলামের যাবতীয় তথ্যাদি সঠিক রেফারেন্সে পেয়ে যাবেন । সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত সারা দিনের ফরজ,সুন্নাত সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা এখানে পেয়ে যাবেন

Thursday, May 30, 2019

জ্যোতিষী।। রম্যগল্প।।মুহাম্মদ শরিফ


                
ভোমরের মত ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছি সেই দুপুর থেকে। ভাবছি কালো প্রাণীটার মত দুইটা ডানা যদি আজ থাকত  ,ডানার ঝাঁপটায় আশেপাশের বিল্ডিংগুলোর জানালার থাই গ্লাস হয়তো বৈরুতের এক্সপ্লোশনের মত টুকরো টুকরো হয়ে যেত। কপাল-পীঠে তিরতির করে ঘাম ছুটছে। কোথায় যে পাবো ব্যাটা জ্যোতিষী কে। হাত দেখে বলে দিতো আমার পরীক্ষার রেজাল্ট, পাশ হবে কি হবে না।অন্তত টেনশনের হাত থেকে রেহাই পেতাম। গতবার ম্যাট্রিক দেয়াল পার করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি, সে গর্বের কথা পাড়াশুদ্ধ লোক জানে। যাইহোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষমেশ কাশিপুর হাটের বটগাছটার নিচে তাঁর যাবতীয় সরঞ্জামাদি পোটলায় গুছিয়ে শুয়ে থাকতে দেখলাম। একটু আগেও এখান দিয়ে গেছি হন্তদন্ত হয়ে, ব্যাটা শুয়ে আছে তাই খেয়াল করিনি। আমি কাছে গিয়ে ডাক দিতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। 
:দাদা, এইখানে শুয়ে আছেন, আর আমি যে সারা মুলুক আপনাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।  
:আজ কাল আর এ ব্যাবসা ভালো চলছে না।কদিন পর উপস করতে হবে ঠাহর করি। 
:কি বলেন?
:হ্যাঁ। 
:তো। কি করবেন ?
:চলে যাবো ভাবছি অন্য এলাকায়। আর কিছুক্ষণ থাকবো ,তারপর রওনা হবো।  
:তাহলে দাদা আমিই মনে হয় এ গাঁ এর শেষ কাস্টমার।আজ একখান পরীক্ষা ছিলো, ভর্তি পরীক্ষা। ২০ টাকার একটা নোট বের করে হাত ধরলাম দাদার সামনে। টাকাটা পকেটে রেখে আমার হাত ধরেই চমকে উঠার ভাব ধরে আমায় বললেন ,সর্বনাশ।
:সর্বনাশ?(আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো।এত কষ্ট করে তাঁকে খুঁজে বের করলাম ভালো কিছু শোনার জন্য ,আর ব্যাটা হাত দেখেই বলে সর্বনাশ)
:হ্যাঁ। একটা শনির রেখা তৈরি হচ্ছে। ১০ টাকার একটা নোট দাও।
দিলাম।না দিলে পরের কথাগুলো বলবে না জানি। 
:তোমার হাতের রেখা দেখে বোঝার উপায়ই নেই , তুমি একদিন অনেক বড় পোষ্টে চাকরি পাবে।
মনে মনে বললাম”হুম, এটা ১০ টাকার ফসল”
আমি বলালাম, আমার পরীক্ষার খবর কি ?
:খুশির খবর আছে, হাত দেখে বুঝলাম, আর ৫০ টাকা দাও,বলছি।
কি বিপদেই না পড়লাম হাত দেখাতে এসে। ৫০ টাকার আরেকটা নোট দিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললো ,তোমার শনি রেখাটাই বন্ধনি একে দিয়েছি। আর সমস্যা হবে না। আর হ্যাঁ, পরীক্ষায় পাশ করেছো। খুব ভালো পাশ।  
কথাটা শুনে তো আমি আহ্লাদে গদগদ, মনের মধ্যে খুশি তো আর ধরে না। উঠে বাড়ির দিকে রওনা হবো, ঠিক ঐ সময় জ্যোতিষী দাদা বললেন মিষ্টি খাওয়াবে না? 
:হ্যাঁ নিশ্চয়।
:কেমনে? আমিতো আর এ গাঁ-এ থাকছি না, কিছু টাকা দিয়ে দাও,কিনে খেয়ে নিবো।
কি না ভেবেই দিয়ে দিলাম আরও ১০ টাকা। বাড়ি ফিরবো, পকেটে হাত দিয়ে দেখি এক টাকাও আর নেই। হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম।
সেদিন রাতে স্বপ্নের তোড়ে আর ঘুমই আসে না। কত্ত রঙ-বেরঙের স্বপ্ন। আগামীকাল রেজাল্ট দিবে, অনেক ভালো পজিশনও হবে। জ্যোতিষী দাদার ভাষ্যমতে “অনেক ভালো পাশ”। জীবনের শনির রেখাও আর নেই ।টেনশনও আর নেই। 
রেজাল্টের দিন। তখন মোবাইলের যুগ ছিলো না। রেজাল্ট জানতে স্কুলে যেতে হতো। গিয়ে দেখি নোটিস বোর্ডে এখনো রেজাল্ট টানানো হয় নি। অনেকেই উপস্থিত হয়েছে এরই মধ্যে। স্যারের মেয়েকেও দেখলাম।এক পাশে চুপটি মেরে বসে আছে। সবাইর মুখটা দেখলাম শুকনো খটখটে। আন্দাজ করতে পারছি যে সবাই খুব টেনশনে আছে। কিন্তু আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ আমি যে ভালো পাশ করেছি তা জ্যোতিষীই বলেছেন। 
টানানো হতে না হতেই উপস্থিত সবাই হূড়মুড় করে ভীড় জমালো নোটিস বোর্ডের সামনে। আমি নিশ্চিন্তে বসে এক টাকার চুইংগাম চিবচ্ছি।দেখলাম, হিরণ চোখ মুছতে মুছতে বেরিইয়ে আসছে।বুঝলাম, ফেল মেরেছে।অনেক উপদেশ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম।রুশোও এলো মন ভারী করে।গরম স্বভাবের ছেলেটাও আজ অরম হয়ে গেছে। পড়ুয়া ছেলে এরা।তারপরও ঝেড়ে বসে আছে। নিজেকে নিয়ে গর্ব হতে লাগলো।সারা বছর না পড়েই ভালো রেজাল্ট করেছি। 
রেজাল্ট।ও মনে পড়েছে আমি এখনো নিজেরটা দেখিনি।দেখবো কখন?ছেলেগুলো ফেল করেছে।তাদের সান্ত্বনা দিতে দিতেই তো সময় চলে গেলো।এতক্ষণে ভিড় কমে গেছে । নোটিশ বোর্ডের দিকে দেখলাম এক বুক আশা নিয়ে। 
আজব!
আমার রোল নাম্বার কৈ?
চেক করলাম। আবার করলাম। বারবার চেক করেও আমার রোল নাম্বার পেলাম না। 
না। এ হতেই পারে না। জ্যোতিষী যে বললো ভালো পাশ হবে আমার। 
বুঝতে আর বাকি থাকলো না।
এই হলো ভালো পাশ? ব্যাটা মিথ্যুক। মায়ের চিনির বৈয়াম থেকে টাকা মেরে তোকে দিয়েছি। আর তুই আমার সাথে দুই নাম্বারি করলি। ধাপ্পাবাজ কোথাকার। মনে মনে গালি পাড়লাম অনেক্ষণ।
ভালো পাশের নমুনাতো দেখলাম। ওদিকে আমার আম্মু যে রাগী, তাতে শনি যে আমার কপালে আছে বুঝতে বাকি নেই।ইতিমধ্যে খবর পৌঁছে গেছে নিশ্চয়। সারাদিন বাড়িতে যাইনি মা-এর সামনে পড়ার ভয়ে।
সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে পা রাখতে যাবো অমনি কয়েকটা কিল-ঘুষি ঝড়ের মত কোত্থেকে উডে এসে হুড়মুড় করে পড়লো আমার পিঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আম্মু। এক দৌড়ে আবার পিছনের দিকের রাস্তায় চলে আসলাম। শুনতে পেলাম,”ম্যাট্রিক পাশ আর আমার টাকা না নিয়ে বাড়িতে ফিরলে তোর খবর আছে, বলে দিলাম”
রাতটা কাননদের কাচারি ঘরে কাটালাম কোনো রকমে। শালা জ্যোতিষীর খবর আছে। জানি, ও এ গায়ে আর নেই। পাশের গাঁ-এ চলে গেলাম বাজারে যেতেই দেখলাম এক পাশে বসে আছে। আমাকে দেখেই চিনে ফেললো। কি খবর জানতে চাইলো?
আমি বললাম, সবই ঠিকঠাক হয়েছে। আপনি সত্যিই মহান জ্যোতিষী। আপনার পাশে কিছু সময় কাটাতে চাই।
দেখলাম,ব্যাটা আমার মত শাগরেদ পেয়ে ভারি খুশি।। আমার মনে তো তখন অন্য কিছু। এই ভন্ড ব্যাটাকে শাস্তি না দিয়ে শান্তি পাচ্ছি না। অনেক্ষণ তাঁর পাশে বসে থাকি সুযোগের অপেক্ষায়। 
হঠাৎ বললো, বাছা একটু বসো আমি প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিয়ে আসি। আমি সুযোগটা পেয়ে গেলাম। আর হাসিমুখে বিদায় দিলাম। চোখের আড়াল হতেই জ্যোতিষীর টাকার কৌটা নিয়ে দিলাম দৌড়।বাড়িতে গিয়েই মায়ের চিনির বৈয়ামে কিছু রেখে বাকিটা  নিয়ে মামা বাড়ির উদ্দ্যেশে রওনা হলাম।    

Friday, May 24, 2019

আপন ভাবি যারে।।কবিতা।।মুহাম্মাদ শরিফ




আমি আপন ভাবি যারে
গোলাপি লাল অন্তরখানা
পোড়াই সে ছারখারে।

আমি আপন ভাবি যারে
বুকভরা ভালোবাসা দিলাম
তবু সে ঘৃণা করে।

আমি আপর ভাবি যারে
মুখের উপরেই ছুরিকাঘাত দিতে
কেমনে সে পারে।

আমি অমানুষও নারে
ইচ্ছা যেমন তেমন করে
কলিজা ছিন্ন করে।

মৃত্যুর উপারে
দেখবে গিয়ে আমায় নিয়ে
জগত ও সংসারে।



Wednesday, May 22, 2019

মহিলাদের নামায।


মহিলাদের নামায ও পুরুষের নামাযের নিয়ম কানুনপ্রায় একই রকম তবে নারীর নারীত্ব ও পর্দার দিকে লক্ষ্য করে তাঁদের নামায আদায় করার পদ্ধতির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে তা ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে আলোকপাত করা হলোঃ

তাকবিরে তাহরীমা
  1. মহিলাদের নামাযের সময় চাদর কিংবা ওড়নার ভিতর সর্বদাই হাত রাখবে এবং তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় ওড়নার ভিতর থেকেই হাত উঠাবে। অতিরিক্ত গরমের কারণে কষ্ট হলেও হাত বের করার অনুমতি নেই ( আর পুরুষের বেলায় বিধান হলো, তারা চাদর পরিহিত থাকলে তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত বের করে নিবে)।-তাহতাবী শরিফ
  2. মহিলাগণ তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবে( তবে লক্ষ্য রাখবে যাতে ওড়নার বাইরে হাত বের না হয়ে যায়।-তাহতাবী শরিফ
  3. মহিলাগণ তাকবীরে তাহরীমা বলার পর উভয় হাত সিনার উপর বাঁধবে। আর পুষগণ নাভীর নিচে বাঁধবে।- শামী
  4. মহিলাগণ হাত বাধার সময় ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর উপর রেখে দিবে। পুরুষ গণের মত কনিষ্ঠা এবং বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা বাম হাতের কব্জি ধরবে না।-আলমগীরী

কিয়াম ( দাঁড়ানো) 
মহিলারা দাঁড়ানো অবস্থায় উভয় পা মিলিয়ে রাখবে অর্থাৎ দুই পায়ের মাঝে কোনো দুরত্ব রাখবে না।এমনি ভাবে রূকু ও সিজদায় টাখনু মিলিয়ে রাখবে। পক্ষান্তরে পুরুষের জন্য বিধান হলো দাড়ানোর সময় দুই পায়ের মাঝে অন্তত চার আঙ্গুল ফাঁকা রাখবে।

রুকু 
  1. মহিলারা রুকুর সময় সামান্য ঝুঁকবে , যাতে হস্তদ্বয় কেবলমাত্র হাটু পর্যন্ত পৌছে আর  হস্তদ্বয় হাঁটুর উপর হালকাভাবে রেখে দিবে।-তহাতাবী
  2. মহিলারা রুকুর অবস্থায় দুই হাতের আঙ্গুল ইচ্ছাকৃতভাবে মিলিয়ে রাখবে।পক্ষান্তরে পুরুষরা  ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকা করে হাটুদ্বয় আকড়ে ধরবে।-তাহতাবী শরিফ
  3. মহিলারা রুকু অবস্থায় পায়ের গোড়ালীদ্বয় সম্পূর্ণ মিলিয়ে রাখবে আর পুরুষরা ফাঁকা রাখবে।
  4.  মহিলারা রুকুর সময় কনুইদ্বয় পাজরের সাথে সম্পূর্ণ মিলিয়ে রাখবে ।পুরুষের ন্যায় ফাঁকা রাখবে না।- ফিকহুল মুয়াচ্ছার 
সিজদাহ 
  1. মহিলারা সিজদার সময় পদযুগল দাড় করে না রেখে ডান দিক বের করে বিছিয়ে দিবে।
  2. আর খুব জড়ো সড়ো হয়ে মাটির সাথে মিশে সিজদা করবে, যাতে পেট উরুদ্বয়ের সাথে এবং বাহু পার্শদ্বয়ের সাথে মিলে থাকে , সেই সাথে উভয় কনুইকে মাটির সাথে লাগিয়ে রাখার প্রতি লক্ষ্য রাখবে । 
বৈঠক 
  1. মহিলারা আত্তাহিয়্যাতুর জন্য বসার সময় বাম দিকের নিতম্বের উপর বসবে এবং ডান দিক দিয়ে উভয় পা বের করে দিবে।পুরুষের মত ডান পা খাড়া রেখে বাম পা বিছিয়ে তাঁর উপর বসবে না।-বেহেশতি জেওর
  2. আত্তাহিয়্যাতুর সময় মহিলারা হাতের আঙ্গুল সমুহ পরস্পর মিলিয়ে রেখে উরুর উপর রেখে দিবে।- তাহতাবী শরিফ 



 

Sunday, May 19, 2019

বাক।রম্য ছোটগল্প।


বাক 

                     মুহাম্মদ শরিফ

তিন চাকার ভ্যান গাড়িটা এসে থামলো একটা ছোট পুরনো বাড়ির সামনে। এরকম বাড়ির সামনে সাধারনত ভ্যান থেকে নামে হয়তো কোনো চাউলের বস্তা, লাকড়ী, বা খড়-পল।কিন্তু আজ একটু ভিন্নতার আভাস মিলছে বুঝি।কারণ ভ্যান চালক এলাকার পরিচিত কেউ নয় আর ভ্যানে উপবিষ্ট যাত্রী পোশাক আশাকে বোঝা যাচ্ছে সাধারন কেউ নয়,এক্কেবারে নববধুর সাঁজ ।অপরূপ তার সৌন্দর্য,সারা গায়ে অলঙ্কারের ছড়াছড়ি।বড়লোকের মেয়ে বুঝি,তাই অমন সাঁজের বাহার। উপচে পড়া সৌন্দর্য গায়ে জড়ানো লাল পাড়ের জামদানী। মেয়েটির মুখে নেই লেশমাত্র কৃত্রিম সৌন্দর্যের বিন্দু। দুই চোয়ালের উপর লালচে আবীর ।এমন সুন্দর মেয়ে দেখলে যে কারো পছন্দ হতে বাধ্য।


এই পাড়াগায়ে এমন মেয়ে তেমন দেখা মেলা ভার।ভ্যান থেকে নামতে দেখে মনজুর মা,শেফা আর বুকু এগিয়ে এসে তাকে সাহায্য করলো।গ্রামে এমন আদর আপ্পায়ন হর হামেশাই মেলে।এরা মাটির মানুষ কি না!! এই তিনজনের চোখে একটা প্রশ্ন জ্বলজ্বল করছে,আর তা হচ্ছে”কে এই মেয়েটি?”আর এ বাড়িতেই বা কেনো?” কারণ সবাই জানে এই বাড়িতে থাকে এক বৃদ্ধ আর তার স্ত্রী।তাদের দুইটি মাত্র ছেলে সন্তান তাহমীদ আর তামীম, ,শহরে পড়াশোনা করে। তাদের তো বিয়েই হয় নি, তো তাদের বউ হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। কারণ তারা অনেক ভালো, বাবা মা এর অনুমতি ছাড়া বিয়ে? তাদের পক্ষে অসম্ভব।। তো যাইহোক, মনজুর মা, মেয়েটির জিনিসপত্র ভ্যান থেকে নামাতে নামাতে বুকু তাকে সালাম করলো।সালামের জওয়াব দিতে দেরি হওয়ায় তিনজনই মেয়েটির দিকে তাকালে সে মঞ্জুর মায়ের কাছ থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে তার ভিতর থেকে একটা কাগজ বের করে সবাইকে দেখালো।তাতে লিখা”ওয়া আলাইকুমুস সালাম”
সে কি ?
মনজুর মা জিজ্ঞাসা করলো”তোমার নাম কি গো? “আরেকটা কাগজ দেখালো তাতে লিখা
মেহেরজান।
ওমা! তুমি কথা বলতে পারো না?শেফার আবেগ ভরা প্রশ্নের উত্তরে মেহেরজান একটা কাগজ দেখালো তাতে লিখা “ আমি বাক-প্রতিবন্ধী ”
এমন সুন্দর একটা মেয়ে কথা বলতে পারে না ,এমন কান্ড আগে কেউ দেখেনি কখনো,  আর তাই আস্তে আস্তে মানিষের ভিড় বাড়তে থাকে। এদিকে মেহেরজান,বুকু,শেফা সবাই বৃদ্ধর বাড়ির মধ্যে চলে এসেছে।রুস্তম দাদা একটা কাঠের পুরনো চেয়ার এগিয়ে দেয় বসতে।এলাকার মহিলা,বৃদ্ধ যতটা না অবাক হচ্ছে তার চেহারা দেখে তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছে তার কথা বলতে না পারা দেখে। কোনো শব্দই করতে পারে না মেয়েটি।তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে মেহেরজান লেখাপড়া জানে,অনেকের অনেক প্রশ্নের উত্তর লিখে দিচ্ছে।

যাইহোক,এবার আসল প্রশ্নটি করলো তাহমীদের মা।
আচ্ছা মা,তুমি কার কাছে,কাদের বাড়িতে এসেছো?
আগে থেকে লেখা একটা চিরকুট বের করে দেখায়।সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা” মোঃ আফজাল হোসেন। গ্রামঃসুবর্ণগ্রাম; জেলাঃ নড়াইল।
-ঠিক ঠিক।হ্যা এটাইতো।কানাকানির শব্দ শোনা যায়। সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
তাহমীদের মা আবার জিজ্ঞাসা করে” উনি কি তোমার পরিচিত? উনি তোমার কি হয় ?
আরেকটা কাগজ বের করে তাহমীদের মা কে দেখালো মেহেরজান।কাগজটিতে লেখা “আমি আপনার বড় ছেলে তাহমীদের স্ত্রী।“ আবার কানাকানি এমন মহামারী আঁকার ধারণ করলো যে এটা না করাটাই অপরাধ।তা হবেই বা না কেনো!!তাহমীদ সুদর্শন পুরুষ,সে কেনো এমন বোবা মেয়ে বিয়ে করতে গেলো তাও আবার বাবা মা এর অনুমতি ছাড়া?ছিঃছিঃ।

ওদিকে রাগে ফুসছে বুকু।এমন কাজ করতে পারলো তাহমীদ? আমি গ্রামের মেয়ে তাই হয়তো আমাকে উপেক্ষা করলো!! না না মেয়েটারই দোষ ।সে হয়তো তাহমীদকে ধোকা দিয়েছে।এমন নানা বিধঘুটে চিন্তা বুকুর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এবার মতিন চাচা এসে জিজ্ঞাসা করলো তোমার বাড়ি কোথায় মা?
আরেক কাগজ দেখালো”বলতে  নিষাধ আছে।“রুস্তম দাদা হাক দিয়ে উঠলেন “ও তাহমীদের মা, তোমার তাহমীদ যেমন সুন্দর বৌমা ও পেয়েছো তেমনি সুন্দর।একদম জান্নাতী হুর।কথা বলতে পারে না এই যা।এ আর তেমন কি? যা প্রয়োজন তা তো লিখেই দিতে পারছে।শিক্ষিত আছে।কোনো সমস্যা হবে না। দাদার কথা শেষ হতেই বুকু বললো” হ চাচী, লক্ষী মেয়ে ,কোনোদিন আপনার সাথে ঝগড়ায় করবে না।এমন মেয়ে ২য় টি পাবেন না।কথাটি রাগে নাকি অভিমানে বললো সেটা বুকুই বলতে পারবে।কথাটি শুনে মেহেরজানও একটু হাসলো।

তাহমীদের মা এবার একটু ভালো করে মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই মেয়েটা অনেক লাবণ্যময়ী।নাক,চোখ মুখের গড়ন অনেকটাই তাহমীদের মতন। ইশশ।মেয়েটা যদি শুধু কথা বলতে পারতো আমার কোনো আপত্তি থাকতো না। তাহমীদের ছোট চাচী এগিয়ে এসে বললো,”আপা,আপনি একটা কাজ করেন তাহমীদকে একটা চিঠি লিখেন।চিঠির উত্তর না আসা পর্যন্ত মেহেরজান আমাদের এখানেই থাকুক। প্রস্তাবে সবাই সম্মতি জানালো।

কিন্তু ওদিকে শুরু হয়েছে আরেক কান্ড মেহেরজান তার নাক ও কানের দুল খুলতেই সবাই অবাক।এত বড় মেয়ে নাক কান কোনোটাই ফোটানো নেই। কেউ কেউ ভাবলো ধনীর দুলালী কি না,তাই হয়তো এই কষ্টটুকুও সইতে পারে নাই। কিন্তু মেয়েতো দেখছি নিন্দা না কুড়িয়ে থামবে না। মাথার কালো কেশ যে নকল,তা খুলে রাখার পর আর কারো বুঝতে বাকি নেই। এবার প্রশংসা কারীরাও নিন্দা করতে শুরু করে দিয়েছে।একটা বউ, তার মাথায় কালো লম্বা কেশ থাকবে না তা শহুরে মানুষ মানলেও গ্রামের মানুষ মানবে কি করে। মেয়ের কি আকাল পড়েছে যে কথা বলতে পারে না,মাথায় লম্বা চুল নেই,কান নাক ফুটানো নেই এমন মেয়ে বিয়ে করতে হবে। এবার কিন্তু তাহমীদের মা একটু মুচকি হাসলেন।কি জানি বাপু কেনো হাসলেন।এমন পাগলী মেয়ে যে তার পূত্রবধু সে খেয়াল কি তার আছে?বুকু চুপিচুপি বললো”ও চাচী তোমার ছেলে কেমন মেয়ে বিয়ে করেছে দেখলে তো?তোমার ছেলের কি চোখ নাই?কোনো উত্তর না দিয়ে চাচী একটু হাসলেন।বুকু রাগে উঠে দাঁড়িয়ে বললো” তোমার খুব পছন্দ হয়েছে বুঝি?
এবার একটা কাগজ দেখালো মেহেরজান আর তাতে লেখা”আমায় একটু পানি দেন।“কেউ একজন পানি এনে দিতেই মেহেরজান হাত্মুখ ধোঁয়া শুরু করলো। মুখ ধোয়া পানিতে ধুয়ে গেলো চোখের কাজল,ঠোটের গোলাপী লিপিস্টিক,চোয়ালে আটকানো রক্তিম আভা।। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতেই ছোট্ট ছেলেমেয়েরা হাততালি দিতে শুরু করলো, জোয়ান-বৃদ্ধরা হাসতে শুরু করলো , পাড়ার মহিলারা হাসতে হাসতে বলতে লাগলো সে কি কান্ড গো এ যে আমাদের তাহমীদ!

তাহমীদের আনা প্যাকেট থেকে প্রত্যেককে মিষ্টি দেওয়া শুরু হলো। সারা বাড়িতে আনন্দ আর হাসিতে মুখর হয়ে উঠে। ওদিকে বুকুর আনত নয়নের দুই কোণে দুফোটা অশ্রু জমতে দেখা যায়।। কে পরিমাপ করবে, এ অশ্রু কতটা আনন্দের ,কতটা ভালোবাসায় সিক্ত?



Saturday, May 18, 2019

নীলনন্দন । ছোট গল্প।





নীলনন্দন
                   -মুহাম্মদ শরিফ 

মায়ের কোল আলো করে চাঁদের মত স্নিগ্ধসুন্দর ফুটফুটে ছোট্ট শিশুর আগমন। ভারি মিষ্টি চেহারা নাদুসনুদুস আর লাল টুকটুকে।দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে এমনই দৃষ্টি আটকে যাওয়া তাঁর চাহনি।মায়ের কাছে তাঁর কান্নার শব্দ এমনই কলিজা ঠান্ডা করা অনুভূতি যে, সমস্ত ব্যাথ্যা মুছে দিতে সক্ষম।কি দারুন চেহারার ঝুরঝুরানি।দবদবে ফর্সা গায়ের আবরণ। সেজন্যই দাদীমা আদর করে রসুনের খোসা বলে ডাকা শুরু করে দিয়েছেন। এ যেনো রাজপুত্র, মহারাজ্যের ছোট্ট মধ্যমণি।এমন সুদর্শন নন্দনলক্ষীর আগমন বার্তা যে বাতাসের আগে ধায়,তা পরক্ষনেই বুঝতে আর তিলটুকু বাকি থাকলো না। ছোট্ট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে পাড়ার এপাশ সেপাশ থেকে চাচি-দাদি-নানিদের আসা-যাওয়া শুরু হয়ে গেছে নন্দন লক্ষীকে এক নজর দেখার জন্য। কিছুক্ষনের মধ্যেই এমন উপচে পড়া ভীড়, সামাল দেওয়াটাই কষ্টের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামলে উঠতে দাদি মিঠায় বিতরণ শুরু করে দিয়েছেন। ছোট ছেলেপুলের চোখ এবার মিষ্টির ঠোঙ্গার দিকে।একটা মিষ্টি নিয়ে সোজা পকেটে ঢুকিয়া দ্বিতীয়টির ধান্ধায় হাত বাড়ালেই দাদি দিচ্ছে এক ধমক।তবে মুরব্বিদের ভীড় কমার তেমন কোনো  লক্ষণ নেই। তাই মতিন মিয়া ভিড়ভাট্টা ঠেলে ভাতিজাকে একনজর দেখে বাইরে এসেই আচমকা আযান দিতে শুরু করে দিলো। কিন্তু দু-এক লাইন বলতে না বলতেই মক্তবের হুজুর এসে ধমক দিয়ে মতিনকে থামালেন। আজহার মিয়াকে ডেকে বললেন “মিয়াঁ, সন্তানের কাছে নিজে গিয়ে তাঁর ডান কানে আযান আর বাম কানে একামত দাও। আর মতিন মিয়াঁ, আযান এমনে জোরে জোরে দেওয়া লাগে না। সন্তানের কানে কানে দিতে হয়।“

আজহার মিয়াঁ, নিজের সন্তানের প্রতি সবার এমন ভালোবাসা দেখে আহ্লাদে কেঁদেই ফেলবেন মনে হচ্ছে। হুজুকে বললেন “দোয়া করবেন হুজুর, ছেলের উপর  কারো বদনজর যেনো না লাগে।“ এইকথা শুনে হুজুর বললেন,”শুন মিয়াঁ এইসব বদনজর-কুনজর বলতে কিছুই নেই। তুমি যদি এই সবের থেকে বাঁচার জন্য সন্তানের কপালে কাজলের কালো টিপ দিয়া রাখো,কালো টিপের উপর ভরসা করো, তাহলে শিরক হবে। অনেক বড় গোনাহ।।“ জুম্মার নামাযে আইসো তোমারা” এই বলে হুজুর চলে গেলেন।
যাইহোক, যে যার কাজে যেতে লাগলো। নন্দনের কাছে এখন মমতাময়ী মা আর দাদি। আজহার মিয়াও মাঠের কাজে বেরিয়ে পড়েছেন। 
নন্দন বড় হচ্ছে। দাদিমার পীড়াপীড়িতে নন্দনের কপালের এক পাশে এঁকে দেওয়া হয় একটা কাজলের  চাঁদ। মতিন মিয়াঁ বারংবার এসে বলে যায় ভাতিজাকে সন্ধ্যার পর যেনো কখনোও বাড়ির বাইরে নেওয়া না হয়। মতিনের ভয়, এমন সুন্দর চেহারার ছেলে দেখলে পরীরা নিয়ে যেতে পারে। এতদিনে নন্দন অল্প অল্প কথা বলতে শিখে ফেলেছে।তবে অস্পষ্ট।তাতে কি? সন্তানের কোনো ভাষাই মায়ের কাছে দুর্বোদ্ধ নয়। যাই বলে না কেনো, মা সেটার উত্তর দেন, আকারে ইঙ্গিতে, ইশারায় বা গল্প বলে। 
কি এক আজব ভালোবাসা, গভীর মমত্ববোধ। মাতৃত্ব যেনো এক একক বৈশিষ্ট্য যা আল্লাহ প্রত্যেক মাকে দিয়ে থাকেন। সন্তান মা-এর আর মা সন্তানের। তৃতীয় পক্ষ নেই , তাঁর অস্তিত্বও নেই। 
মাঝে মাঝে নন্দনের ঘুম আনার জন্য মা তাঁর পায়ের উপর রেখে দোল দেয়, নন্দনের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটানোর জন্য মা নিজের আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে দেন আবার হঠাৎ করে আঁচল সরিয়ে ভয় পাইয়ে দেওয়ার ব্যার্থ চেষ্টা করেন । যার প্রতিউত্তরে একটা কলিজা ঠান্ডা করা হাসি দিয়ে মায়ের অন্তর শীতল করে দেয় নন্দন। শান্তির  স্পর্শ মায়ের মনকে বরফ শীতল করে দেয়। কি ছলনাশূন্য ভালোবাসা, যার মধ্যে কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছোঁয়া নাই। 
মায়ের কাছে সন্তান পৃথক কিছু নয়, এ যেনো নিজের কলিজার একটা অবিচ্ছেদ্য খন্ড। যা দূরে রাখা সম্ভব নয়। মাতৃহৃদয় সেকথা কখনো কল্পনাও করতে পারে না।কলিজার ধন ছাড়া জীবন ছন্নছাড়া ,গতিহীন, নিথর ও অন্তঃসারশূন্য। মায়ের কলিজার ধন যতই বড় হতে লাগলো ততই তাঁর মাথায় বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে লাগলো। এ যেনো রাজপুত্রের রাজ্য রক্ষা বা ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা। কিন্তু রাজপুত্র তো এখনো হাটতেই শিখেনি, তাতে কি? তাই বলে তো ঘরে বসে থাকা যাই না। হামাগুড়ি দিয়েই আপাতত কার্যোদ্ধার করার চেষ্টা চলতে লাগলো। মা তাকে যে, হাতিম, জুজু, বানর, বাঘের বৃথা ভয় দেখায় সেটা সে বুঝতে পেরেছে আর সেজন্য মায়ের নতুন ভৌতিক উদ্ধাবন আনারসের ডোরাকাটা খোসা। এতেই রাজপুত্র কুপোকাত।
তখন সময়টা বোধ করি এপ্রিলের শেষের দিক। আম গাছের আমে, এখনো পরিপক্কতা আসে নি। হঠাৎ বৃষ্টি হলো আর আনারসের খোসাগুলো বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেলো। এখন প্রতিবন্ধকতা নাই ভয়ও নাই । একটু ঝকঝকে রোদে উঠানের স্যাঁতস্যাঁতে ভাবটাও আর নেই। শুরু হলো নন্দনের অভিযান। একটু একটু করে পা বাড়িয়ে মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যেতে থাকে নন্দনমানিক।বাইরে হালকা বাতাস বইছিলো সেদিন। আমগাছের পোকাই খাওয়া গুটি হালকা বাতাসেই নিচে পড়ছে আর ছোট ছেলেমেয়েরা সেগুলো পাল্লা দিয়ে আম কুড়ানোর ছোটো ছোটো ডোলায় তুলে নিচ্ছিলো। নন্দনও তাঁদের সাথে যোগ দিলো অবলীলায়।
হঠাৎ একটা পোকায় খাওয়া আম এসে পড়লো নন্দনমানিকের সামনে আর ছেলেমেয়ে গুলো তাকিয়ে আছে নন্দনের দিকে। আমটি তুলে কি করে নন্দন, সেটা দেখার জন্য। আমের গুটিটি ধরেই মুখে পুরতে উদ্যত হয়। অমনিই কোত্থেকে এক বিষাক্ত পিঁপড়া এসে রাজপুত্রের ধবধবে সাদা পীঠের উপর বিষাক্ত কামড় বসিয়ে দেয়। নন্দনের চিৎকারে মা দৌড়ে ছুটে আসেন আম গাছের নিচে, দেখেন নন্দন কাঁদছে । ছেলেমেয়েগুলো ততক্ষণে দৌড়ে পালিয়েছে সেঁজুতি ছাড়া। সে কাহিনী খুলে বললো । কিন্তু পিঁপড়াটা যে খুবই বিষাক্ত ছিলো তা আর বুঝতে বাকি থাকলো না।কারণ ততক্ষণে বিষের প্রভাবে নন্দনের চেহারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। লাল সুন্দর চেহারাটা কেমন নীল হয়ে যাচ্ছে দাদী, চাচা-চাচি আশেপাশের সবাই ছুটে আসে। যে যার মত করে প্রথমে চেষ্টা করেও কোনো সুফল পেলোনা। বাজারের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যখন রওনা দিবে এমনসময় রাস্তায় এক হাতুড়ে ডাক্তারের সাথে দেখা। নন্দনের শরীর দেখেই ডাঃ বললেন আর নেওয়া লাগবে না। ও আর বেঁচে নেই। নন্দনের মা সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। মাথায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরার সাথেই মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ “আমার নন্দন কৈ? ও নন্দনমানিকরে আমার। আমার নন্দন কৈ? আমার নন্দন…“ সাথে সাথে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
অন্যদিকে , নন্দনকে উঠানে একটা ছোট খাটের উপর শোয়ানো হয়েছে। মক্তবের হুজুর এসে পানি পড়ে মুখের উপর ছিটিয়ে দেখলেন কাজ হয় কি না। হলো না। নন্দনের দাদা-নানা দুজনেই কবিরাজ । দুজনের চেষ্টাই ব্যার্থ। গ্রামের বড় তুলোরাশি বলে খ্যাত হাবিবুর শেখ তাঁর সমস্ত কিছু দিয়ে চেষ্টা করতে থাকলেন। কাজ হচ্ছে না। এতক্ষণে নন্দনের লাল-সুন্দর চেহারার পুরোটাই বিলুপ্ত হয়ে নীল বর্ণ ধারণ করেছে। কেউ মাঝেমাঝে নাকের উপর হাত রেখে দেখতে চেষ্টা করছে শ্বাস বইছে কি না। মায়ের অবস্থা একবার জ্ঞান ফিরছে আরেকবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। যে সন্তান কোল আলো করে এসেছিলো, ছোট ছোট অস্পষ্ট কথায় কলিজা ঠান্ডা করে দিয়েছিলো। সেই কলিজার ধন চিরোদিনের মত হারিয়ে যাবে। কি করে মেনে নিবেন মা। পুত্রশোক যে কি বেদনাদায়ক তা কেবল সেই মা-ই বলতে পারেন যার পুত্রবিয়োগ ঘটেছে। যে সন্তানের একটি হাসি হাজারো দুঃখ মুছে দিয়েছিলো সেই মহামূল্যবান মাণিক নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অসহায়ের মত জন্মদাতৃ মা হয়ে এটা কিভাবে সহ্য করা সম্ভব?
আজহার মিয়াঁকে ডাকতে মতিনকে পাঠানো হয়েছে । প্রায় দুই কিলো দূরের একটা ক্ষেত দেখতে গিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বড় কবিরাজ এসে দেখে কিছু একটা অনুমান করতে পেরেছেন, কিন্তু কাউকে কিছু না বলে নিজের থলের ভিতর থেকে একটা লোহার কাঁচি বের করে নন্দনের কপালের উপর তা ঘুরাতে শুরু করলেন, আর একজন তুলারাশিকে বললেন হাত চালাতে।। শরীরের মধ্যে বিষ যেখানে, তুলারাশির হাত মাটি থেকে চলতে চলতে সেখানে গিয়ে থামে। নন্দনের ক্ষেত্রে হাত একদম মাথায় গিয়ে থামছে। মানের বিষ নন্দনের মাথায় উঠে গেছে। আর এমনটি কেউ বাঁচে না। জানে সবাই। 
ওদিকে মতিন দৌড়াতে দৌড়াতে পৌছে গেছে, গিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগলো“ভাইজান,বাড়ি চলেন, নন্দনেরে কিসে যানি কামড়াইছে,আব্বাই,নন্দনের নানাই কিচ্ছু করতে পারে নাই। সারাডা শরীল নীল হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতি পারতিছে না ঠিক মত।দ্রুত চল ভাইজান”বলে বড় ভাইয়ের উত্তরের অপেক্ষায় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে মতিন। তখনই আজহার মিয়াঁর গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেলো।স্ব প্নে দেখেছিলেন, একটা ঘোড়া তাঁর ঘরের সামনে এসে দাড়ানোর পরেই ঘোড়ার গলা আলাদা হয়ে গেলো। তারপর তিনি ঐ ঘোড়ার দেহ আর গলা নিয়ে এলাকার সুপরিচিত কারী সাহেবের নিকট নিয়ে গেলে তিনি আবার গলা ঘোড়ার দেহ খন্ডের সাথে জোড়াইয়া দিলেন। স্বপ্নই যদি ইঙ্গিত হয় তাহলে তো নন্দনের মরে যাওয়ার কথা নয়।। আমার নন্দনের কিচ্ছু হয় নাই ,কিচ্ছু হবে না। বলে নিজেকে স্বান্তনা দিতে থাকলেন। কিন্তু ভিতরে যে দূর্বলতা আর রক্তক্ষরণ শুরু হচ্ছিলো তা তো আর কারো চক্ষুষ্মান হওয়ার কথা নয়। দুজনেই রওনা দিলেন বাড়ির দিকে।
বাড়ির উঠানে মানুষের ঢল। নন্দনের খবর যে শুনছে, দৌড়ে আসছে। সবারই মুখে আল্লাহ আল্লাহ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ কালেমায়ে শাহাদাত পড়ছে। 
আজহার মিয়াঁ বাড়ির কাছাকাছি আসতেই যার সাথে দেখা হচ্ছে , সে একটু-আধটু স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাতে আজহার মিয়ার দূর্বলতা কমছে না বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তখনও মনের জোর বোঝানোর জন্য আজহার মিয়াঁ সবাইকে বললেন”আমার নন্দনের কিছুই হয় নাই, হবেও না, আমি স্বপ্নে দেখেছি” বলতে বলতে বাড়ির একদম কাছে আসতেই দেখলেন বাড়ি ভর্তি মানুষ। তখন আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারলেন না। বুকচেরা আর্তনাদ।কান্না আর কতক্ষণ জোর করে চাপিয়ে রাখা যায় মিথ্যা স্বান্তনায়? চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সুরুজ, রাজীব আর মতিন আজহার মিয়াঁকে ধরাধরি করে একখানে বসালেন। এমনিতেই আজহার মিয়াঁ বড়ই নরম স্বভাবের মানুষ, তারপর আবার এমন নির্মম আঘাত কেমনে সইবেন। ঝর ঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দিলেন বাচ্চা মানুষের মত।। 
ওদিকে, সেই যে কাঁচি ঘোরানো শুরু হয়েছিলো এখনো চলছে। মক্তবের হুজুর বারান্দার এককোণে গিয়ে একাধারে, একধ্যানে নামায পড়ছেন, হুজুরের ছোট ছেলে হাফেজ ইবরাহিম সুমধুর কন্ঠে কোরআন তিলায়তে মশগুল আছে । বারবার সূরা ইয়াসিনের আয়াতগুলো শোনা যাচ্ছে। ঘরের ভিতরে কয়েকজনের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ভিড়ের অনেকেই আল্লাহ আল্লাহ করছেন। আসলে মানুষ যাকে প্রকৃতই ভালোবাসে তাঁর জন্য মন থেকেই দোয়া করে। এতে কোনো কার্পণ্য  করে না।
এমন মুহূর্তে হঠাৎ কেমন যানি সবাই নীরব হয়ে গেলো। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। একদম পিনপতন নীরবতা যাকে বলে। নন্দন। কি হলো নন্দনের? কাঁচি ঘোরানো বন্ধ করে দিয়েছেন। তুলারাশির হাত থেমে গেছে। এত মানুষের ভীড়, কারো পায়ের শব্দ পর্যন্ত নেই। সবাইর কান্না কি শেষ হয়ে গেলো? ছোট্ট যে দেহটা নীল হয়েছিলো তাঁর অস্তিত্ব কি…! না এ হতে পারে না। এমন ভাবনা উপস্থিত সবাইর মধ্যেই বিরাজ করছে।।তারপর নন্দনের একমাত্র মামা রাইসুল আল্লাহু আকবার বলে চিৎকার দিয়ে উঠলেন “ আমাদের নন্দন বেঁচে আছে! ঐ যে দেখো তোমরা, দেখো” 
এই একটি চিৎকারই যেনো ঘর উঠানসমেত সমস্ত মানুষের প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেকের নয়ন জলে চোখ ছলছল করছে। আবেগ ধরে রাখতে না পেরে অনেকে কেঁদেই দিলেন। এমন আনন্দে চোখের পানি ধরে রাখা কি সম্ভব!! আস্তে আস্তে নন্দনের দেহের নীল রং মিলিয়ে যাচ্ছে, ফিরে আসছে সেই সুন্দর নয়ন জুড়ানি চেহারার লাবণ্যতা । এক দৌড়ে ছেলের কাছে চলে আসলেন আজহার মিয়াঁ। নন্দন চোখ খুলছে। আসমানে দিকে তাকিয়ে আল্লাহর শুকরীয়া আদায় করছে বুঝি। মা এসে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে থাকলেন । তবে এ কান্না আর একটু আগের কান্নার মধ্যে অঢেল পার্থক্য আছে।  

Monday, May 13, 2019

মৃত্যু।। কবিতা।।



মৃত্যু
                                  মোহাম্মাদ শরিফ 

সহায় সম্বলহীন এক যুবক 
এতীম জন্ম থেকেই
একা একা ঘুরে ফিরে তাঁর
দূঃখের শেষ নাই।

যত আত্মীয় স্বজন ছিলো
সবে গিয়েছে মরে
অসহায় এতীম যুবক ছেলেটির
নয়ন আশ্রু ঝরে।

বন্ধু নাই,স্বজন নাই
একাই জীবন কাটে
মজদুরি দিতে গেলো একদিন
কদমতলীর হাটে।

গৃহস্ত এক কিনে নিলো তারে
কিছু দিনের জন্য
যুবক ভাবিল সঙ্গি পাবো
ঘুচাবে জীবন অরণ্য। 

একা থাকার সব বেদনা
যাবো আমি ভুলে
একাই যদি থাকতে হয়,খোদা
নিয়োগো আমায় তুলে।

বাড়িতে গিয়ে দেখলো যুবক
একাই মজদুর সে
একাই খাবে,একাই যাবে
ধান ক্ষেতে জমি চাষে।

গেল একদিন কাটতে ধান
বাধলো বোঝা পাটে
এত বড় হলো বোঝা
পারেনা একা উঠাতে।

ধৈর্য ধরে বসে রইলো
চেয়ে দিগন্তের পান,
আর একজন যদি পেতাম
হতো একাজে আছান।

সন্ধ্যা বেলা ঘনিয়ে এলো
এদিকে এলো না কেউ
আর পারে না সইতে দুঃখ
মরতে চাই সে ও।

এবার দেখলো কেউ একজন
আসছে এদিক পানে
বড্ড দেহ,মানুষ না জ্বিন
কি হবে কে তা জানে?

দেহখানা বললো বজ্র কন্ঠে 
আমি মালাকুল মউত
চেয়েছো মৃত্যু,এসেছি আমি
ঘোচাতে দুঃখ আঘাত।

ভয়ে থরথর কাপছে যুবক
কাঁপুনি বুকের পাটায়
যুবক বললো বোঝাটা ভারী
উঠিয়ে দাও গো মাথায়।

কষ্ট যতই হোক দুনিয়ায় 
মরতে চাই না কেউ,
মরবার আশা করলেও,পরে
মউত দেখলে ভেউ।

গলায় রশি বা বিষের শিশি
ইচ্ছা করেই নেয়
ছটফট করে বাঁচার জন্য,যখন
জানটা বাহির হয়।

আত্মহত্যা মানেই দোযখ
এর বিকল্প নাই
স্বাভাবিক মৃত্যু,ঈমানের সাথে
সবারই যেনো নসীব হয়।।